রেনি গ্যাননের মুসলিম নাম শেখ আবদুল ওয়াহিদ ইয়াহইয়া। ফ্রান্সের একজন নামকরা পণ্ডিত। তিনি একাধারে খ্যাতিমান লেখক ও দার্শনিক ছিলেন। একটি ধনী ক্যাথলিক পরিবারে ১৫ নভেম্বর ১৮৮৩ সালে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা ছিলেন প্রকৌশলী। ছেলেবেলা থেকে রেনি অসম্ভব প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে রেনি স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে তিনি ধর্ম বিষয়ে পড়াশোনা করতে থাকেন। কেননা খ্রিস্টধর্মের প্রতি তিনি আশ্বস্ত হতে পারছিলেন না। ধর্ম নিয়ে তিনি একাধিক চিন্তাবিদ ও দার্শনিকের সঙ্গে আলাপ-আলোচনাও করেন। তার পরও তাঁর মানসিক প্রশান্তি অর্জিত হয়নি। রেনি গ্যানন তাঁর মানসিক অশান্তি দূর করতে পড়ালেখা সম্পন্ন করার আগেই বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করেন।

ইতিমধ্যে দুজন নওমুসলিমের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। তাঁদের একজন শেখ আবদুল হক, যিনি ফ্রান্সের অধিবাসী এবং ‘আত-তারিক’ নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। অন্যজন আবদুল হাদিম, যিনি ফিনল্যান্ডের অধিবাসী। শেখ আবদুল হক মিসর থেকে প্রকাশিত ‘আনসারি’ পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করতেন। ১৯০৯ সালে রেনি গ্যানন ‘আল মারিফাত’ নামক একটি ম্যাগাজিন চালু করেন। এতে পণ্ডিত ব্যক্তিদের লেখা প্রকাশিত হতো। পত্রিকাটিতে বিভিন্ন ধর্মের ওপর তুলনামূলক প্রবন্ধ প্রকাশ করা হয়। পত্রিকাটি প্রায় চার বছর চালু ছিল।

১৯১২ সালে রেনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং আবদুল ওয়াহিদ ইয়াহইয়া নাম ধারণ করেন। ইসলাম গ্রহণ করার পেছনে কাজ করেছিল তাঁর অবিশ্রান্ত গবেষণা ও সত্যকে জানার প্রবল আগ্রহ। এ ক্ষেত্রে শেখ আবদুল হক ও শেখ হাদিরও অবদান ছিল অফুরন্ত। এই দুজনের বাইরে শেখ আবদুর রহমান ইলিয়াস আল কবির আল মাগরিবি তাঁকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেন। তিনি ছিলেন মিসরের গ্র্যান্ড মুফতি ও একজন খ্যাতনামা ইসলামী আইনশাস্ত্রবিদ। শেখ আবদুল হাদির মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে রেনির পরিচয় হয়।

সেই সময় প্যারিসের একটি বিখ্যাত পাবলিশিং হাউসে রেনির চাকরি হয়। তারা তাঁকে কায়রো গিয়ে বিভিন্ন সুফির মূল্যবান লেখা অনুবাদ করে তা ছাপানোর দায়িত্ব দেয়। ১৯৩০ সালের ফেব্রুয়ারিতে রেনি গ্যানন কায়রো যান। সেখানে তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস করার সিদ্ধান্ত নেন। তবে কায়রো ছেড়ে আসার আগেই তাঁর মা-বাবা ও স্ত্রী মারা যান। ফলে তিনি মর্মবেদনা নিয়ে কায়রো ছেড়ে আসেন। ১৯৩৭ সালে রেনি কারিমা বিনতে আবদুর রহমানকে বিয়ে করেন এবং তিনি তাঁর বাকি জীবন ইসলাম ও মুসলমানের জন্য উৎসর্গ করেন।

উল্লেখ্য, রেনি গ্যাননের লেখা ও গবেষণা পড়ে এবং তাঁর ব্যক্তিগত সংস্পর্শে এসে বহু ইউরোপীয় পণ্ডিত ইসলাম গ্রহণ করেন। তাদের মধ্যে শেখ ঈসা উদ্দিন ছিলেন দর্শনের একজন নামকরা প্রফেসর। বিভিন্ন ধর্মের তুলনামূলক গবেষণামূলক লেখায় তাঁর খুব নাম ছিল। তিনি বহু গ্রন্থ রচনা করেন।

রেনির হাতে ইসলাম গ্রহণ করা আরেকজন নামকরা নওমুসলিম হচ্ছেন আবু বকর সিরাজ উদ্দিন—পূর্ব নাম মার্টিন লিংস। মার্টিন ইংরেজি ও আরবিতে ছিলেন সমান পারদর্শী। তিনি শুধু একজন ধর্মীয় পণ্ডিত ব্যক্তিই ছিলেন না, বরং একজন বড়মাপের কবি ও অনুবাদক ছিলেন। ভাষাবিদ তিতাস বুচারদাতও রেনি গ্যাননের অনুপ্রেরণা পেয়ে ইসলাম কবুল করেন। জার্মান, ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ, সুইস, আরবি ও পারসিয়ান ভাষায় তিনি খুবই পারদর্শী ছিলেন।

রেনি গ্যানন ১৯৫১ সালের ৭ জানুয়ারি ৬৫ বছর বয়সে মারা যান।