আমাদের সমাজে অনেকেই রাজনীতি করেন নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য। প্রচলিত গণতান্ত্রিক ধারার রাজনীতি এই স্বার্থ কেন্দ্রিক বুনিয়াদের উপরই গড়ে উঠেছে। আর সাম্প্রতিক সময়ে এসে এই প্রবণতা ইসলামী রাজনীতির অঙ্গনেও ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। আর সেই কারণেই সকল লোভ-লালসার উর্ধ্বে থেকে দেশ এবং উম্মাহর কল্যাণে রাজনীতি করার মত মানুষ দিন দিন আশংকা-জনক হারে কমে যাচ্ছে। অথচ নিকট অতীতেও ইসলামী রাজনীতির অঙ্গনে ইখলাসের মানদন্ডে উত্তীর্ণ রাজনীতিক নেতৃবৃন্দের অভাব ছিল না। কিন্তু এমন নিবেদিত-প্রাণ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সংখ্যা বর্তমানে হাতে গোনা মাত্র কয়েকজনই অবশিষ্ট আছেন। অতএব এরা চলে যাবার পর এ ময়দানের অবস্থাটা কি দাঁড়াবে এ নিয়ে বিদগ্ধজনদের অনেকেই মাঝে-মধ্যে গভীর আশংকা ব্যক্ত করে থাকেন।
আর আমরা বর্তমানে সে অভাবটি অনেকাংশে উপলব্ধি করতে পারি বাবায়ে জমিয়ত নামে খ্যাত জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের বিগত দিনের সভাপতি আল্লামা আশরাফ আলী বিশ্বনাথী (রাহ্.)-এর বর্ণাঢ্য কর্ম-জীবনের অবসানের মাধ্যমে। কেননা, আমার দেখা জমিয়ত নেতৃবৃন্দের মাঝে তাঁকে আমি রাজনৈতিক ময়দানে এতটাই নিঃস্বার্থ ও নিবেদিত-প্রাণ দেখেছি যে, আজ চারিদিকে ঈমান বেচা-কেনার সরগরম রাজনৈতিক হাটে দাঁড়িয়ে মর্মে মর্মে তাঁর অভাব ও শুন্যতা তীব্রভাবে অনুভব করছি। কারণ, সকল প্রকার দুনিয়াবী স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে মন-মস্তিষ্ক ও চিন্তা-চেতনায় তিনি ছিলেন জমিয়তের রাজনীতির মাধ্যমে আল্লাহর যমীনে আল্লাহর দ্বীন কায়েমের জন্য শতভাগ নিবেদিত-প্রাণ একজন মর্দে মুজাহিদ।
প্রতিষ্ঠা লাভের পর বিগত শত বছরে জমিয়তের অনেক নিবেদিত-প্রাণ নেতা-কর্মী গত হয়েছেন, যাঁদের অনেককেই আমি বা আমার প্রজন্মের অনেকেই স্বচক্ষে দেখেননি- তবে আমার দেখা নেতৃবৃন্দের মাঝে যে সকল নেতৃবৃন্দকে আমরা জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের শীর্ষ নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত দেখেছি, তাঁদের মাঝে লিল্লাহিয়াত ও ইখলাসের মানদ-ে আল্লামা আশরাফ আলী বিশ্বনাথী (রাহ্.) ছিলেন কিংবদন্তী-তূল্য একজন সফল নেতৃপুরুষ।
কারণ, জমিয়তের সাংগঠনিক কার্যক্রমকে সচল রাখতে এই মানুষটি আজীবন নিজের সবটুকু শ্রম-মেধা, আন্তরিকতা এমন কি সহায়-সম্পদ পর্যন্ত অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন। কেননা, বিশ্বাসের গভীর থেকেই তিনি আকাবীর-আসলাফের পবিত্র আমানত জমিয়ত তথা ইসলামী রাজনীতিকে ইবাদত মনে করে এর চর্চা করে গেছেন।
বিগত শতাব্দীর শেষ দুই বছর এবং চলমান শতাব্দীর প্রথম দুই বছর। অর্থাৎ, ১৯৯৯-২০০০ ও ২০০১-২০০২ খ্রীষ্টাব্দ এই চার বছর খুব কাছ থেকে আমি তাঁর সাংগঠনিক তৎপরতা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ লাভ করেছি। কারণ, ঐ সময়টাতে জমিয়তের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের মাঝে আমার বাবা মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রাহ্.) ছিলেন আল্লামা আশরাফ আলী বিশ্বনাথী (রাহ্.)-এর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধাদের একজন, অর্থাৎ, একজন জমিয়তের সভাপতি, অন্যজন নির্বাহী সভাপতি- ফলে সাংগঠনিক না না প্রয়োজনে তাঁদের দু’জনকে ঘন ঘন পরামর্শ ও আলাপ-আলোচনা করতেই হতো। আর তাই আল্লামা আশরাফ আলী বিশ্বনাথী (রাহ্.) তখন নিয়ম করে প্রত্যেক রাত দশটা থেকে এগারোটার মধ্যে বাবাকে ফোন করে দীর্ঘ প্রায় এক/দেড় ঘন্টা জমিয়তের বিভিন্ন সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে কথা বলতেন। ঘন ঘন দেখা-সাক্ষাতও হতো দু’জনের মাঝে। এমন কি শেষ জীবনে বার্ধক্য-জণিত কারণে বেশ দুর্বল হয়ে যাওয়ার পরও তিনি রাজধানী কেন্দ্রিক জমিয়তের যে কোন ছোট-বড় কার্যক্রমে স্বশরীরে অংশগ্রহণ করার জন্য সিলেটের সেই সুদূর বিশ্বনাথ থেকে বহু কষ্ট স্বীকার করে মাসে তিন/চার বার ছুটে আসতেন ঢাকায়।
আজ সাজানো-গোছানো জমিয়ত নামক যে বাগানে আমরা অবাধে বিচরণ করছি, তরুলতা-হীন তপ্ত মরুর বুকে হৃদয়ের সবটুকু অর্ঘ্য নিবেদন করে সে বাগানকে শস্য-শ্যামল করে তিলে তিলে গড়ে তুলতে আল্লামা আশরাফ আলী বিশ্বনাথী (রাহ্.)-এর ন্যায় ত্যাগী মনীষীদের অতুলনীয় অবদান জমিয়তের সকল পর্যায়ের নেতা-কর্মী এবং জাতি আজীবন কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ রাখবে।
উল্লেখ্য যে, ঐতিহাসিক দেওবন্দ আন্দোলনের চেতনা-বিধৌত একমাত্র রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হচ্ছে জমিয়ত। আর তাই জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের যে সমৃদ্ধ রাজনৈতিক ঐতিহ্য রয়েছে, ভারত উপমহাদেশের আর কোন রাজনৈতিক দলের সে ঐতিহ্য নেই।
আর এ কারণেই রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে জমিয়তের এমন কিছু ইতিবাচক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে- যা উপমহাদেশের অন্যান্য সমসাময়িক রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নেই। যেমন, অন্য সকল রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন আঞ্চলিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে অঞ্চল কেন্দ্রিক। আর জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম গড়ে উঠেছে ঈমানী উত্তাপ তথা চেতনা-কেন্দ্রিক। অর্থাৎ, পৃথিবীর যে সকল অঞ্চলে দেওবন্দ আন্দোলনের চেতনা বহনকারী উলামায়ে কেরাম ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন বা ছিলেন, সেই সকল দেশ ও অঞ্চলে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম স্বতন্ত্র মহিমায় প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। আর তাই আমরা আজও দেখতে পাই যে, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা এমন কি সুদূর বিলেতেও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কোন শাখা নয়, বরং সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও পরিপূর্ণ সংগঠনিক কাঠামো রয়েছে। আর উল্লেখিত প্রতিটি দেশেই জমিয়ত তার স্বাধীন ও স্বতন্ত্র নিয়ম-পদ্ধতিতে রাজনৈতিক কর্মকা-ে সক্রিয় রয়েছে।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের আরো একটি ইতিবাচক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই মকবুল কাফেলাই একমাত্র রাজনৈতিক দল- যারা লেজুর-বৃত্তিক রাজনীতি, কিংবা সাহেবজাদা নির্ভর নেতিবাচক রাজনৈতিক কালচার তথা আবর্জনা থেকে নিজেদের কার্যক্রমকে শত বছরব্যাপী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে পেরেছে। তবে কেউ হয়ত বলতে পারেন যে, ভারত-পাকিস্তান জমিয়তের ক্ষেত্রে একথা শতভাগ সত্য নয়। সেক্ষেত্রে আমার বক্তব্য হচ্ছে- উল্লেখিত দেশ দুটোতে জমিয়তের যে রাজনৈতিক উত্তরাধিকার আমরা দেখতে পাই, সেখানে রক্তের উত্তরাধিকারের মোটেও কোন স্থান ছিল না, বরং নিজ নিজ যোগ্যতা বলেই পরবর্তী প্রজন্মের কেউ কেউ সাংগঠনিক ধারাবাহিকতায় নেতৃত্বের আসনে উঠে এসেছেন।
বাবায়ে জমিয়ত আল্লামা আশরাফ আলী বিশ্বনাথী (রাহ্.)-এর স্মরণে দু’চার কথা লিখতে গিয়ে অপ্রাসঙ্গিক ভাবে জমিয়তের সংগঠনিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে কথাগুলো এ জন্যই বললাম যে, আল্লামা আশরাফ আলী বিশ্বনাথী (রাহ্.) কর্ম-জীবনের সুদীর্ঘ সময়-ব্যাপী জমিয়তের অত্যন্ত প্রভাবশালী শীর্ষ নেতা হওয়া স্বত্ত্বেও তাঁর সন্তানদের কাউকেই প্রভাব খাটিয়ে জমিয়তের কোন গুরুত্বপূর্ণ পদে সমাসীন করার চেষ্টা ঘুণাক্ষরেও কখনো করেননি। অথচ তিনি জমিয়তের শীর্ষ পদে থাকাকালীন তাঁর সন্তানদের মধ্যে অন্ততঃ বড় তিন ছেলে জমিয়তের নিবেদিত-প্রাণ কর্মী ছিলেন এবং আজও আছেন।
আর জমিয়তের জন্য এই লিল্লাহিয়াত ও ইখলাস শুধুমাত্র বাবায়ে জমিয়ত আল্লামা আশরাফ আলী বিশ্বনাথী (রাহ্.)-এর ক্ষেত্রেই নয় বরং আল্লামা শায়খে কৌড়িয়া (রাহ্.) থেকে শুরু করে সদ্য প্রয়াত জমিয়ত সভাপতি আল্লামা শায়খে ইমামবাড়ী (রাহ্.) প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য। তাঁদের এই অতুলনীয় ত্যাগকে ভাষা দিয়ে সংজ্ঞায়িত করার সামর্থ্য আমার নেই। শুধু এটুকুই বলতে পারি, রাহমাতুল্লাহি আলাইহিম জামিআন।
পবিত্র মাহে রমযানের সবচেয়ে মহিমান্বিত এই রজনীতে আমি মহান মাওলা পাকের দরবারে হৃদয়ের সবটুকু আবেগ-অনুভূতি নিবেদন করে বাবায়ে জমিয়ত আল্লামা আশরাফ আলী বিশ্বনাথী (রাহ্.)-সহ সূচনাকাল থেকে আজ পর্যন্ত এই অনন্য ঈমানী কাফেলার অতীত-বর্তমান ও অনাগত সকল নিবেদিত-প্রাণ নেতৃবৃন্দের পরকালীন নাজাত ও দারাজাত-বুলন্দীর জন্য কায়মনোবাক্যে এই প্রার্থনা করছি, হে আল্লাহ্! জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম নামক এই দ্বীনী কাফেলার সকল নেতৃবৃন্দ আজীবন তোমার প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ‘উক্বাব’ তথা পতাকা অত্যন্ত ইখলাসের সাথে বহন করে গেছেন। অতএব পরকালের প্রতিটি মনযিলে তুমি তাঁদেরকে তোমার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র জামাতের অন্তর্ভূক্ত করে নিও। আল্লাহুম্মা আমীন।

লেখক: আহমদ বদরুদ্দীন খান
সাহেবজাদা: আল্লামা মুহিউদ্দীন খান রহ: সম্পাদক : মাসিক মদীনা
২৭ রমযান ১৪৪১ হিজরী