আফগানিস্তানে দুই দশক পর তালেবান শাসন ফিরেছে, তবে আর গণতন্ত্র ফিরবে না। বরং শরিয়া আইনেই এখন থেকে দেশ চলবে বলে স্পস্ট করে জানিয়ে দিয়েছে তালেবান। গতকাল বুধবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শীর্ষ তালেবান নেতা ওয়াহিদুল্লাহ হাশিমি বলেন, কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আদৌ থাকবে না। কারণ, আমাদের দেশে এর কোনো ভিত্তি নেই। আফগানিস্তানে কোন ধরনের রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা কায়েম করা হবে, তা নিয়ে আমরা আলোচনা করব না। কারণ, এটি স্পষ্ট। আর তা হল শরিয়া আইন। এটাই শেষ কথা।


আফগানিস্তানে তালেবান শাসন ফেরায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশটিতে আবারও উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়েছে গোটা দক্ষিণ এশিয়া তথা সারা পৃথিবীতে। ইতোমধ্যে অতীতের ভীতিকর পরিস্থিতি স্মরণে নিয়ে আফগানদের দেশত্যাগের মরিয়া চেষ্টার বিভিন্ন ছবি সারা দুনিয়ায় আলোড়ন তুলেছে। আর এতেই ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে দেখা দিয়েছে নতুন করে শরণার্থী ঢলের আশঙ্কা।


আবার অনেকে বলছেন, মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বাহিনীর অনুপস্থিতিতে তালেবান শাসনে সংঘাতপূর্ণ দেশটি হয়ে উঠবে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে চীন, রাশিয়া, ভারত, পাকিস্তানের মতো রাষ্ট্রগুলোর প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র। যদিও ক্ষমতা দখল করেই তালেবান দাবি করেছে, দুই দশক আগের শাসনের সঙ্গে তাদের আসন্ন শাসনের মধ্যে মিল থাকবে না। ইতোমধ্যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ঘোষণা করা হয়েছে সাধারণ ক্ষমা। শরিয়া আইন অনুযায়ী দেশ চললেও নারীরা কিছু অধিকার ভোগ করবেন। সেই সঙ্গে আফগানিস্তানকে আর আগ্রাসী বহির্শক্তির প্রভাব বিস্তারের সামগ্রী তারা হতে দেবে না। যদিও তালেবানের এসব আশ্বাসে ভরসা রাখতে পারছে না কেউই। সে জন্যই প্রশ্নের সঙ্গে কৌতূহল দেখা দিয়েছে কেমন হবে তালেবান সরকার? কোথায়ই-বা গিয়ে দাঁড়াবে সাধারণ আফগানদের ভবিষ্যৎ?
আপাতত আসন্ন সরকার কেমন হবে তার একটি ইঙ্গিত গত মঙ্গলবার কাবুলে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনে দিয়েছেন তালেবানের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ। ইসলামি শরিয়া অনুযায়ী দেশ পরিচালনার কথা বলেছেন তিনি। সেই সঙ্গে নারীদের কাজ ও শিক্ষায় বাধা না দেওয়া, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সন্ত্রাসীদের আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করতে না দেওয়ার কথাও বলেছেন।


সংবাদ সম্মেলনে জাবিউল্লাহ মুজাহিদ বলেন, তারা সরকার গঠনের জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন। সব পক্ষ, সব গোষ্ঠী, সবার অন্তর্ভুক্তি তারা নিশ্চিত করবেন। কাজ সম্পূর্ণ হলে সরকার ঘোষণা করা হবে। তিনি বলেন, নারীরা আমাদের সমাজে খুবই সক্রিয় ভূমিকা রাখবে এবং তারা বাইরে কাজ করতে পারবে।
তবে সেটা হবে শরিয়া আইনের কাঠামোর মধ্যে। তালেবান শাসনে আফগানিস্তান আবার আল কায়েদা বা অন্য চরমপন্থি যোদ্ধাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠবে কিনা- এমন প্রশ্নে মুজাহিদ বলেন, আফগানিস্তানের মাটি কারোর বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। আমরা এটা স্পষ্ট করতে চাই, আফগানিস্তান আর কোনো যুদ্ধক্ষেত্র নয়। যারাই এতদিন আমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, সবাইকে আমরা ক্ষমা করেছি। শত্রুতার দিন শেষ। দেশের ভেতরে বা বাইরে- কোথাও কোনো শত্রু আমরা চাই না।
আফগান গণমাধ্যম টলোনিউজকে এক সাক্ষাৎকারে তালেবানের উচ্চপদস্থ এক নেতা জানিয়েছেন, সরকার গঠনে তারা তাড়াহুড়ো করতে চাইছেন না। আপাতত তাদের লক্ষ্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়। তবে দেশ শাসনের রূপরেখা তৈরিতে কাতারের রাজধানী দোহায় তাদের বিশেষ বৈঠক হয়েছে। সেখানে ভবিষ্যৎ সরকারব্যবস্থা এবং নাম নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে খুব দ্রুতই জানানো হবে। পাশাপাশি দেশে শান্তি আনতে তারা অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ করছেন। তালেবানের রাজনৈতিক উপনেতা মোল্লা আবদুল গনি বারাদার বলেছেন, বর্তমানের প্রতিটি মুহূর্ত তালেবানের জন্য পরীক্ষা। কারণ এখন জনগণের নিরাপত্তার জন্য আমাদের কাজ করতে হবে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ সরকার সম্ভবত তালেবান গঠিত বিশেষ একটি কাউন্সিলের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। যার দায়িত্বভার নিতে পারেন শীর্ষ তালেবান নেতা হায়বাতুল্লাহ আখহুন্দজাদা। একই সঙ্গে নতুন সরকার সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক পাইলট ও সেনাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করবে, যাতে তারা আগের কাজে যোগ দেন।
এদিকে তালেবানদের আফগানিস্তান দখলের পর গতকাল বুধবার প্রথম তাদের বিরুদ্ধে কয়েকটি শহরে বিক্ষোভ হয়েছে। মূলত তালেবানের পতাকার বদলে দেশটির জাতীয় পতাকা বহাল রাখার দাবিতে এই বিক্ষোভ হয়। যা নিয়ে পাকিস্তান সীবান্তবর্তী গুরুত্বপূর্ণ জালালাবাদ শহরে গুলিতে অন্তত ৩ জন নিহত ও বেশ কিছু মানুষ আহত হয়েছেন। আবার কাবুল বিমানবন্দরের পরিস্থিতিও গতকাল ছিল গোলযোগপূর্ণ। এদিনও পশ্চিমা দেশগুলো তাদের নাগরিকদের সরিয়ে নিয়েছে।
অন্যদিকে পদচ্যুত আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি শেষ পর্যন্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। আরব আমিরাত সরকার জানিয়েছে, মানবিক দিক বিবেচনায় তারা গনিকে সেখানে আশ্রয় দিয়েছেন। তবে দেশ ছাড়ার সময় গনি অন্তত ১৭ কোটি মার্কিন ডলার নিয়ে গেছেন বলে জানিয়েছেন তাজিকিস্তানে অবস্থানরত আফগান দূত।
এর মধ্যে তালেবানের সরকার গঠনের প্রেক্ষাপটে আবার দৃশ্যপটে এসেছেন দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই। কাবুল দখলের শুরুর দিনই কারজাই টুইটারে জানান তিনি কাবুলেই আছেন। তিনি দাবি করেন, আগামী সরকার গঠন নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করছেন। হামিদ কারজাই হাক্কানি নেটওয়ার্কের কমান্ডার আনাস হাক্কানির সঙ্গে বৈঠক করেন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এ খবর জানিয়েছে। তাদের বৈঠকের ছবিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে। ওই বৈঠকে আফগানিস্তানের সাবেক সরকারের শান্তি আলোচনার প্রধান আব্দুল্লাহ আব্দুল্লাহও উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু তাদের মধ্যে কী নিয়ে আলোচনা হয়েছে তা প্রকাশ করা হয়নি। হাক্কানি নেটওয়ার্ক যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকায় রয়েছে।
আবার আফগান সরকারের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আমরুল্লাহ সালেহ অডিওবার্তায় নিজেকে দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বৈধ প্রধান হিসেবে দাবি করেন। একই সঙ্গে তিনি এটাও বলেন, ‘যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি।’
এদিন মোল্লা আব্দুল গনি বারাদারসহ তালেবানের শীর্ষনেতারা কাবুলে পৌঁছেছেন বলে বিবিসির খবরে বলা হয়েছে। এর আগের দিন বারাদার কাতার থেকে আফগান শহর কান্দাহারে পৌঁছান। এই কান্দাহারই তালেবান ও বারাদারের জন্মস্থান। ধারণা করা হচ্ছে, বারাদারই হতে যাচ্ছেন তালেবান সরকারের প্রধান।